Featured

স্থাপত্যের প্রকৃতি

Tadao Ando
Tadao Ando, Photo © Kazumi Kurigami

আজকের দিনে সমাজব্যবস্থা অনেকাংশেই তথ্যকেন্দ্রিক (information-oriented) হয়ে যাচ্ছে; যার ধারাবাহিকতায় স্থাপত্যবিদ্যাও এই অবাধ তথ্যপ্রবাহের একটি অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। বলাবাহুল্য, ‘তথ্য’ হিসেবে স্থাপত্যের গুরুত্ব অগ্রাহ্য করার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু চিন্তার বিষয় হচ্ছে যে, স্থাপত্যের সকল প্রায়োগিক দিকের মধ্যে কেবলমাত্র এই অংশটিতে ইদানীং বেশি জোর দেয়া হচ্ছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য মানুষকে আকৃষ্ট করা। ফলশ্রুতিতে, উপাদান বস্তু (material object) হিসেবে স্থাপত্যকে তেমন একটা মূল্যায়ণ করা হচ্ছেনা। বরং, বিল্ডিংগুলোকে এমন চটকদার ভাবে ডিজাইন করা হচ্ছে যেন ফটোগ্রাফিতে দেখতে ভালো লাগে। আমরা জানি যে, অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থার সাথে স্থাপত্যের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই, আর্থ-সামাজিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন স্থাপত্যকে অনেকাংশেই প্রভাবিত করে। যেমন, জাপানে জমির দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হওয়ায় অস্থায়ী বিল্ডিং তৈরি করার একটা প্রবণতা দেখা যায়, যাতে সহজেই যে কোন সময় বাড়িগুলো ভেঙ্গে ফেলা যায়, এবং পুনঃনির্মাণ করা যায়।

 

১৯৫০ এর দশকের শেষের দিকে মডার্নিজম ধারা যখন তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন কার্যকারিতা (functionalism) ও অর্থনৈতিক যুক্তিবাদিতার (economic rationalism) কারণে মডার্নিজমের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কারণ, পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল সমাজ আস্তে আস্তে তথ্যকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছিলো। এসময় বিভিন্ন নতুন ধারার আগমন ঘটতে থাকে; যার মধ্যে পোস্ট-মডার্নিজম অন্যতম। কিন্তু পোস্ট-মডার্নিজম ধারা তার উদ্দেশ্য বা অবজেক্টিভ সম্পর্কে কখনোই সুস্পষ্ট কোন ধারণা দেয়নি। বরং, এ ধারাতে মডার্নিজম দ্বারা পরিত্যক্ত ঐতিহাসিক ফর্ম এবং অলঙ্করণরীতি পরোক্ষভাবে পুনরায় ফিরিয়ে আনার একটা সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা ছিলো; যা পোস্ট-মডার্নিজম ধারার সীমাবদ্ধতা হিসেবে গণ্য করা হয়। শুধুমাত্র আর্কিটেকচারাল ফর্ম নিয়ে কাজ করার কারণে মডার্নিজম দ্বারা উদ্ভুত সমস্যাগুলোর প্রকৃত কোন সমাধান পোস্ট-মডার্নিজম দিতে সক্ষম হয়নি। ফলশ্রুতিতে, পোস্ট-মডার্নিজম এখন মুমূর্ষু অবস্থায় আছে বলা যায়। এমতাবস্থায়, সময়ের খেয়াস্রোতে বাতিল হয়ে যাওয়া মডার্নিজমের মূল উপাত্তগুলো বর্তমান সময়ের নিরীখে পুনরায় বিবেচনা করা প্রয়োজন।

 

সব বিষয়কে সব সময় সর্বজনীন (generalize) করা যায়না। কারণ, তাহলে ব্যাপারটা একদল মানুষকে শুধুমাত্র “সংখ্যা” হিসেবে বিবেচনা করার মত হয়ে যায়। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে নিজস্ব আবেগ, ইচ্ছা এবং চাহিদা থাকে; যার সমন্বয়ে একজন মানুষের নিজস্ব স্বত্ত্বা গড়ে ওঠে; এবং এই কারণে প্রতিটি মানুষ একে অপরের চেয়ে আলাদা হয়। কিন্তু, আমরা যদি সর্বজনীনতা লাভের উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত স্বকীয়তাকে অগ্রাহ্য করতে শুরু করি, তাহলে ধীরে ধীরে একজন ব্যক্তি তার স্বতন্ত্র “ব্যক্তিস্বত্ত্বা” হারিয়ে ফেলবে, এবং রূপকার্থে একটি বৃহৎ সংখ্যার ক্ষুদ্র এককে পরিণত হবে। স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি একই। ‘সর্বজনীন স্থাপত্য’ মতবাদের অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ বর্তমানে বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব স্থানীয় সংস্কৃতির জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে; কারণ, সর্বজনীনতার একটি অন্যতম মুখ্য দিক হচ্ছে আদর্শীকরণ (standardization)। আমরা যদি স্থাপত্যচর্চায় নির্ধারিত কোন  আদর্শ নীতিমালা অনুসরণের স্বার্থে স্থানীয় সংস্কৃতিকে অগ্রাহ্য করি, তাহলে বিশ্বের সব শহরের সব বিল্ডিংগুলো দেখতে একই রকম হয়ে যাবে; যেটা মোটেই প্রত্যাশিত নয়। এমতাবস্থায়, সভ্যতার অগ্রগতির স্বার্থে সাংস্কৃতিক উপাদান ত্যাগ করতে না চাইলে, আমার মনে হয় আমাদের স্থাপত্যের সংজ্ঞা নতুন করে ভাবতে হবে।

 

এখন, প্রশ্ন আসতেই পারে, স্থাপত্য কি! আমার মতে, স্থাপত্য হচ্ছে অসংখ্য স্বতন্ত্র ব্যক্তির নিজস্ব আদর্শ অনুযায়ী করা কাজের সমষ্টি; যা তার দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্থানীয় জলবায়ুর প্রেক্ষাপট অবলম্বনে সৃষ্ট। এই স্থাপত্য সংস্কৃতির অংশ, সভ্যতার নয়। কিন্তু বর্তমানে স্থাপত্য তৈরির কাজ স্বতন্ত্র ব্যক্তি অর্থাৎ স্থপতিদের হাতে না দিয়ে বরং বিভিন্ন সংগঠনের হাতে ছেড়ে দেয়ার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। হাতের বদলে কম্পিউটারে কাজ হচ্ছে। সবকিছুতে এখন যান্ত্রিকতার ছোয়া। এক সময় স্বতন্ত্র ব্যাক্তিদের স্বপ্ন, উৎসাহ-উদ্দীপনা, আর নিরলস পরিশ্রমের ফসল হিসেবে যে অসাধারণ স্থাপত্যকীর্তি গড়ে উঠতো, এখন তা সংগঠনের নীতিমালার কাগজ, আর যান্ত্রিকতার বেড়াজালের সাধারণ গণ্ডির মধ্যে দিন দিন আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

 

পরিশেষে, স্থাপত্য শুধুমাত্র সময়ের নিরীহ প্রতিফলনই ঘটায় না, এটি সময়ের সমালোচনা করতেও অনুপ্রেরণা যোগায়। এছাড়াও স্থাপত্য চিন্তাভাবনার স্বাধীনতার প্রতিনিধিত্ব করে। স্থাপত্য নিয়ে চিন্তা করা বলতে যে শুধুমাত্র বাহ্যিক অবস্থা বা ফাংশনাল সমস্যা নিয়ে কাজ করা বোঝায়, তা না। আমি বিশ্বাস করি, স্থপতিদের ফান্ডামেন্টাল ভিত্তি বা মূলনীতি নিয়ে প্রশ্ন করা শিখতে হবে। নিজস্ব কল্পনার জগৎ তৈরি করে নিতে হবে, যেখানে তারা স্থাপত্য নিয়ে মুক্তভাবে স্বপ্ন দেখতে সক্ষম। এবং অবশ্যই মানুষকে নিয়ে ভাবতে হবে। মানুষের জীবন, ইতিহাস, ঐতিহ্য, এবং জলবায়ু- কোনটাই বাদ দেওয়া যাবেনা। আমাদের অবশ্যই এমন আর্কিটেকচারাল স্পেইস তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ বিভিন্ন রকমের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারবে- কবিতা কিংবা গানের মত; কখনো সে বিস্মিত হবে, কখনো নতুন কিছু আবিষ্কার করবে, কখনোবা উদ্দীপিত হবে, কখনো প্রশান্তি লাভ করবে, আবার কখনোবা হয়তো খুঁজে পাবে জীবনানন্দ। আমার মতে, এখানেই স্থাপত্যের সার্থকতা।

u5k94umbc150zzj9
Tadao Ando, Photo © Nobuyoshi Araki

(তাদাও আন্দোর লেখা “Nature and Architecture” শীর্ষক প্রবন্ধ অবলম্বনে)

Advertisements

মুহূর্তের মাঝে অনন্ততা

(This is my Bengali interpretation of Architect Tadao Ando‘s article “The Eternal Within the Moment” about the traditional Japanese architecture in the modern context and its influence on his works) Continue reading “মুহূর্তের মাঝে অনন্ততা”

জিওফ্রে বাওয়ার স্থাপত্যকথন

(This is my Bengali interpretation of an article written by Architect Geoffrey Bawa regarding the vernacular architecture style of Sri Lanka)

Sri_Lanka_Arch_AKAL_82013947_AKAL_UpperDeck_View_G_A_H.(1)

আমার নিজস্ব গবেষণায় আমি অতীতের বিভিন্ন অধ্যায় সম্পর্কে জেনেছি ও বুঝার চেষ্টা করেছি। উদাহরণস্বরূপ আমি বলতে পারি, মধ্যযুগে ইতালীর পাহাড়ি এলাকায় গড়ে উঠা শহরগুলো, যেখানে জমকালো ও সহজাতপ্রবৃত্তির “মাসিং” (massing) এর প্রাধান্যতা ছিলো। যদিও কালের পরিক্রমায় এবং উদ্দেশ্যের প্রেক্ষাপটে এসব শহরে কিছুটা ভিন্নতা ছিল, কিন্তু সামগ্রীকভাবে এরা একটি চমৎকার দৃশ্যপট সামনে নিয়ে এসেছিল। এছাড়াও আমি বলতে পারি ইংরেজ গ্রামের বাড়ি এবং এর সাথে গড়ে উঠা উদ্যান এবং বাগান; গ্রীক, রোমান, মেক্সিকান এবং বৌদ্ধ সভ্যতার ধ্বংসস্তুপ, গ্রানাডার আলহামরা, রনশ্যাম্পের উপাসনালয়, রাজস্থানের মুঘল দুর্গসমূহ এবং পদ্মনবপুরামের বিস্ময়কর প্রাসাদের কথা। এছাড়াও প্রায়ই আমার চোখ আটকে যায় কোন একটি নিখুঁত ল্যান্ডস্কেইপে, কখনোবা একটি সাধারণ দৃষ্টিনন্দন ভবন, আবার কখনোবা একটি বিশাল জাকজমকপূর্ণ ভবনে। এরকম স্থাপনার সৌন্দর্য আমার চোখে ধরা দেয় বাস বা ট্রেইনের জানালা হতে, কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের জন্য, আবার কখনোবা এক বা দুইদিন ধরে; আবার কখনো বেশ কিছুদিন ধরে, ক্যামব্রিজ বা রোমের স্থাপনাসমূহের মত। এসব স্থাপনা, বাগান এবং ল্যান্ডস্কেইপের সৌন্দর্যের রেশ আমার অবচেতন মনে গেঁথে যায়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যবহারিক সমস্যা সমাধানে আমার জন্য সহায়ক একটা ভূমিকা পালন করে। যেমন, সাইটের মধ্যে সঠিক জায়গায় স্থাপনাটি বসানো; বা ফ্রেইমের প্রয়োজনে কোন একটি ভিউকে জোর দেওয়া, বা স্পেইস তৈরি করা; কিংবা একটি রুমের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণে আলো ছায়ার আবহ সৃষ্টি করা। শ্রীলঙ্কার যেকোন ভাল স্থাপনার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো যে এগুলোতে অনুরাধাপুরা, পলোন্নারুয়া বা সিজিরিয়ার মন্দির কিংবা প্রাসাদসমূহের স্থাপত্যশৈলীর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা হয়েছে। এবং যুগের ধারাবাহিকতায় এই ব্যাপারটি বর্তমান পর্যন্ত চলছে। আর আমি শ্রীলঙ্কার দর্শনীয় স্থাপত্যকে- শুধুমাত্র শ্রীলঙ্কান স্থাপত্য বলতেই পছন্দ করি। ভারতীয়, পর্তুগীজ বা ডাচ, কিংবা সিংহলীয় বা ক্যান্ডীয়, বা ব্রিটিশ নয়। এইসব ভিনদেশীয় শাসনামলের স্থাপত্য নিদর্শনসমূহ আমার মতে শ্রীলঙ্কার নিজস্ব সত্তাকেই প্রতিনিধিত্ব করে ।

bawa1

যখন আমরা প্রাচীন এইসব স্থাপনার নিদর্শনসমূহের দিকে তাকাই, আমরা দেখতে পাই যে এরা শ্রীলঙ্কার দৈনন্দিন জীবনধারার অপরিহার্য বিষয়গুলোর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু যদিও অতীতের উদাহরণ আমাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে, এই মুহূর্তে আমাদের কি করতে হবে সেই ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ কোন ধারণা দিতে পারেনা। এটা সত্য যে বর্তমানের সাথে অতীতের অনেক “ম্যাটারিয়ালের” মিল আছে। এমনকি এদের ব্যবহার ও প্রয়োগও আগের মতই আছে; যদিও প্রায়োগিক কৌশল এবং বৈশিষ্ট্যে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এসব পুরনো এবং নতুন ম্যাটারিয়েল ব্যবহার করে আমাদের এমন একটি সমাজব্যবস্থার জন্য ডিজাইন করতে হবে যেটি এখন একটি কঠিন অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; যেখানে জীবন অনেক গতিময় ও স্বাধীন, এবং যেখানে প্রয়োজনের তাগিদে বিশ্বাস ও জীবন ব্যবস্থায় এসেছে সংস্কার; আর উদারতান্ত্রিক সমঝোতা। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও, জীবনের সকল টানাপোড়েনের মধ্যে একটি ধ্রুবক সর্বদা বিদ্যমান; আর সেটা হচ্ছে জলবায়ু।

Geoffrey-Bawa

সকল স্থাপনার একটি অপরিবর্তনীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে ছাদ। স্থান ও কাল নির্বিশেষে নান্দনিকতা এবং সুরক্ষার আবহ তৈরিতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কখনো দেখা যায়, ছাদ, কলাম আর মেঝে নিয়েই একটি স্থাপনা গড়ে ওঠে; যেখানে ছাদের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি, আর ছাদ হয়ে ওঠে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতীক। একথা অনস্বীকার্য যে ছাদ এবং তার আকৃতি, বিন্যাস আর অনুপাত যেকোন ভবনের সবচেয়ে শক্তিশালী দর্শনীয় উপাদান।

এখন একটি অতি সাধারণ বস্তু নিয়ে আলোচনা করা যাক, যেটাকে এখন সিংহলীয় টাইল বলা হয়। কয়েক শতাব্দী আগে, আরব বণিকরা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে এ ধরনের অর্ধগোলাকার মাটির তৈরি “রুফিং টাইল” শ্রীলঙ্কায় নিয়ে আসে, যেগুলো ছাদের উপরে বসানো হতো। যদিও শ্রীলঙ্কায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় এখানের ছাদগুলো ঢালুভাবে তৈরি হত। পর্তুগীজ ও ডাচরাও একই ধরনের টাইল দিয়ে ছাঁদ বানাত, কিন্তু হল্যান্ডে ঠান্ডা বেশি হওয়ায় ডাচদের ছাদগুলো উপরের দিকে উঁচু হত। ক্যান্ডীয়দের দেশ পাহাড়ি হওয়ায় তারা মসৃণ ও সমতল আকৃতির কাদামাটির “টাইল” ব্যবহার করত। তাদের সভাকক্ষসমূহে শুধু কলাম বা স্তম্ভ থাকত, কোন দেয়াল ছিল না। যেন জীবনে চলার পথের একটি অমীমাংসিত উত্তর খুঁজে পাওয়া যেতো এখানে- একটি বড় ছাদ, যা একই সাথে ছায়া এবং সুরক্ষার কাজে লাগত; সাথে ছিলো মুক্ত বাতাসের অবাধ প্রবাহ, আর নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের হাতছানি। “ফাংশান” (function) আর “ফর্ম” (form) এর নিবিড় সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই স্থাপনাতে একই সাথে নান্দনিকতা আর পরিকল্পনার সমাবেশ ঘটেছিল।

6781902998_3b449b16e4_b.jpg

এগুলো আমার প্রাথমিক ধারণা। এছাড়াও খুঁটিনাটি বিভিন্ন বিষয় সামনে আসে; যেমন, কক্ষ, দরজা এবং জানালাসমূহের অনুপাত; ছাদের উচ্চতা ও পুরুত্ব; কক্ষের ভিতর থেকে একজন যদি তাকায় তাহলে কি দেখবে; কক্ষের বাইরের দৃশ্য কতটুকু খোলামেলা হবে ইত্যাদি। এসব ব্যাপার বিবেচনায় আনলে এদেরকে কোন নিয়ম দ্বারা আবদ্ধ করা যায়না। এবং এসকল নিয়ম নীতি সবসময় যে সব প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারে তাও না। আবেগ এবং যুক্তি এই দুইয়ের সমন্বয়েই আমাদের চলতে হবে। এই পর্যায়ে এসেই একজন স্থপতি তার সঞ্চিত জ্ঞানের বাইরে তার মেধা, মননশীলতা আর সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা শুরু করেন। সেটা প্রায় অবচেতন মনেই ঘটে। আমি মনে করি, প্রত্যেক স্থপতিই এক্ষেত্রে আলাদা ও স্বকীয় প্রণোদনা নিয়ে কাজ করে্ন। আর বাস্তবতার নিরীখে একথা অনস্বীকার্য যে, কোন প্রজেক্টে চলার সময় একজন স্থপতিকে সকল ক্ষেত্রে প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ নিজের মত করে নিতে হয়।

আমার মতে একটি বিল্ডিংকে ভালোভাবে বুঝতে হলে এর চারপাশ এবং ভিতর দিয়ে আমাদেরকে হেঁটে যেতে হবে, এবং বিল্ডিং এর অভ্যন্তরের প্রতিটি স্পেইসকে অনুভব করতে হবে। এক স্পেইস থেকে অন্য স্পেইসের ভিউ, ল্যান্ডস্কেইপ ভিউ, বিল্ডিং এর বাহির থেকে ভিতর কিংবা এর চারপাশের ভিউ, বা এক কক্ষের ভিতর দিয়ে অন্য কক্ষ বা কোর্টের ভিউ- এই সব কিছুকেই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে, অনুধাবন করতে হবে। একই সাথে, বাইরের বাগান এবং ভিতরের কক্ষসমূহে আলো এবং ছায়ার খেলার ব্যাপারে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরী। স্পেইসের মধ্যে স্বস্তিদায়ক ও ফাংশনাল আবহ তৈরির পাশাপাশি আনন্দঘন পরিবেশের সম্ভাবনা তৈরি করার গুরুত্ব কোন অংশে কম নয়। কেউ যদি একটি বিল্ডিং এর নকশা করা এবং সেটিকে বাস্তবে রূপ দান করার কাজটিকে উপভোগ করতে পারে, এবং এর মধ্য থেকে সৃষ্টির আনন্দ খুঁজে নেয়, তাহলে তার পক্ষে কাজটি পুঙ্খনাপুঙ্খভাবে ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করা অনেকটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্যেকটি প্রজেক্টই ভিন্নধর্মী; তাই সাইট ও উদ্দেশ্যের ভিন্নতা বজায় রেখে তৈরি করা প্রতিটি স্বতন্ত্র ডিজাইনের সাথে শতভাগ সম্পৃক্ত থেকে নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে কাজ শেষ করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থাপনার ভিত্তি হতে শুরু করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশে সমান গুরুত্ব প্রদান করা অবশ্যই বাঞ্চনীয়।

Geoffrey-Bawa-the-Best-of-Sri-Lankan-Architecture-10.jpg

ক্ষুদ্র এই পরিসরে আমি স্থাপত্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি; যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি যে স্থাপত্যকে ভাষা দ্বারা বর্ণনা করা যায়না। উদাহরণস্বরূপ, আমি সবসময়ই যে কোন জায়গায় যে কোন স্থাপনা দেখতে পছন্দ করি; কিন্তু সেই স্থাপনা সংক্রান্ত কোন নিবন্ধ পড়ার ব্যাপারে আমার তীব্র অনীহা। কারণ, আমি মনে করি যে, স্থাপত্যকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে কখনোই পুরোপুরি বুঝানো যায়না, বরং স্থাপত্যকে অনুভব করার মাধ্যমে নিজ থেকে আস্বাদন করে নিতে হয়। এখানেই স্থাপত্যের অপার মহীমা।